মোহনগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার মাঘান সিয়াদার ইউনিয়নের মল্লিকপুর মৌজায় পুরনো সরকারি হালট গলগলি ভিটায় হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্মশানখলা ও গোচারণভূমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে দখলমুক্ত করণের লক্ষ্যে ওই হালটে স্থানীয় প্রশাসন সাইবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার হাওর অঞ্চল মোহনগঞ্জ উপজেলার মল্লিকপুর গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। ওই গ্রামে সাত থেকে আটশ পরিবার হিন্দু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে। তাদের প্রধান কাজ কৃষি। কৃষি কাজ করেই তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। গ্রামের সামনে প্রায় ৫০০ কাটা জমির গলগলি মল্লিকপুর নামে গোচারণ ভূমি রয়েছে। ওই গোচারণ ভূমিতে মল্লিকপুর গ্রামের মানুষ গলগলি গোচারণ ভূমিতে গরু- ছাগাল বিচরণ করে থাকেন। সম্প্রতি গত ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর পার্শ্ববর্তী শেহরাতলী গ্রামের শাহীন মিয়া, কাউসার, লেবেল ও তাদের লোকজন মল্লিকপুর গ্রামের লোকজনকে গরু- ছাগল চড়াতে নিষেধ করে। তারা ওই গোচারণ ভূমি সরকার থেকে ইজারা নিয়েছে বলে এলাকাবাসীকে জানায়। মল্লিকপুর গ্রামবাসী গরু- ছাগল নিয়ে গেলে তাদের তাড়িয়ে দেয় এবং গালমন্দ করে। দখলদাররা গোচারণ ভূমিতে অস্থায়ী ছাপড়া ঘর তৈরি করেছে। গ্রামবাসী বিষয়টি মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
পরে গত মঙ্গলবার স্থানীয় প্রশাসক গোচারণ ভূমি দখলমুক্ত করণে ওই ভূমিতে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে এবং দখলদারদের ওই ভূমি ছেড়ে ও ঘর উঠিয়ে নেওয়ার জন্য বলেছে।
মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওরের পাশে মল্লিকপুর গ্রামের সামনে গলগলি হাওর এলাকা বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বিশাল এলাকাজুড়ে হাওর। ওই হাওরের মাঝখানে বিস্তৃর্ণ খালি জায়গা। ওই জায়গায় বেশ কিছু ছাপড়া ঘর। গোচারণ ভূমিতে বেশ কয়েকটি সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। কথাহয় বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীর সাথে। গ্রামের লোকজন দখলদারদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্থ।
মল্লিকপুর গ্রামের বিমল চন্দ্র মজুমদার, ঝুটন চন্দ্র গুণ, ক্ষিতীশ গুণ, দিলীপ তালুকদার, পল্লাদ সরকারসহ বেশ কয়েকজন এলাকার বাসিন্দার সাথে কথা হয়। সবাই জানান, তারা বাপ- দাদার আমলে থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে মরিøকপুর গ্রামে বসবাস করছেন। গ্রামের সামনে গলগলি হাওরে গরু- ছাগল ছড়াতেন। এর আগে এমন ঘটনা ঘটেনি। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে পার্শ্ববর্তী শেহরাতলী গ্রামের কাউসার, শাহীনসহ বেশ কয়েকজন তাদেরকে ওই ভূমিতে গরু- ছাগল নিয়ে যেতে দেয় না। প্রশাসনকে জানালে প্রশাসনের লোকজন এলাকায় গেলে ওরা চলে যায়। প্রশানের লোকজন চলে গেলে ফের দখলদাররা আবারও ফিরে এসে গ্রামবাসীকে গোচারণ ভূমিতে যেতে নিষেধ করে।
মল্লিকপুর গ্রামের সত্তরোর্ধ বয়সী বিমল চন্দ্র মজুমদার বলেন, আমাদের এই গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল। বাপ দাদা চৌদ্দ পুরুষ বৃটিশ আমল থেকে গলগলি ভিটায় আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন গবাদিপশু গরু ছাগল পালন করে আসছি। মল্লিকপুর গ্রামের কেউ মারা গেলে গলগলি ভিটায় শ্মশানখলায় শ্মশানঘাটে মরদেহ আগুনে পুড়ানো হয়।
বছর- দেড় বছর ধরে পাশের শেওরাতলী গ্রামের কাউসার, শাহীনসহ বেশ কয়েকজন জোরপূর্বক দখলে নিয়ে আমাদেরকে হুমকি- ধামকি ও সরকারি গোচারণভূমিতে যাইতে দেয় না। গ্রামের লোকজন গেলে মারধরের ভয় দেখায়। আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে আছে। এনিয়ে মল্লিকপুর গ্রামবাসী সকলে মিলে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ দেই। প্রশাসনের লোকজন এসে না করে গেলে শাহনি, কাউসাররা চলে যায়। আবার আসে এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভয়ভীতি দেখায় কেন প্রশাসনকে জানানো হয়। প্রশাসনের কাছে জানানোর পর থেকে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে। আমরা খুব আতঙ্কেও মধ্যে আছি। সরকারের কাছে দাবী মল্লিকপুর গলগলি ভিটা দখলমুক্ত করাসহ আমাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার।
সেওরাতলী গ্রামের কাওসার বলেন, অহেতুক মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। গলগলি হাওরে আমার আবাদি জমি রয়েছে। ওই জায়গায় গরু ছাগল না যায় তা নিষেধ করেছি। আমি কাউকে গরু- ছাগল ছড়াতে বাধা দেইনি। তবে শাহীন মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাকে এলাকায় পাওয়া যায়নি।
মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম এ কাদেরের নেতৃত্বে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সাইবোর্ড টানানো হয়েছে সরকারি ভূমি দখলমুক্ত করার জন্য। আবারও যদি কেউ আসে তাহলে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) নির্দেশে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মোহনগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম এ কাদের বলেন, মল্লিকপুর গ্রামবাসীর লিখিত অভিযোগ পেয়ে পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দখদারদের সরকারি ভূমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। সরকারি ভূমিতে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। আশা করছি মল্লিকপুর গলগলি ভিটায় অভিযুক্তরা আগামী দিনে আর আসবে না।
মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমেনা খাতুন বলেন, স্থানীয় কিছুলোক সরকারি হালট গ্রামের মানুষের গোচারণ ভূমি দখলের চেষ্টা করছিল। খবর পেয়ে এসি ল্যান্ডকে পাঠানো হয়েছিল। অস্থায়ী স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আবার যদি দখলের চেষ্টা করে তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
