নেত্রকোনা সংবাদদাতা:
নেত্রকোনা, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, শনিবার]: বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) অনুমোদনের পথে পা বাড়াতেই নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি সংগঠন নেত্রকোনাতে এক প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনাটি (২০২৬-২০৫০) গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশ ও সমাজের প্রভাব পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা হয়নি এবং জনগণের অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিগণ।
এ সময় বক্তব্য রাখেন, এন ডিসি নেত্রকোনা নির্বাহি পরিচালক জামাল উদ্দিন খান, পল্লী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সুমন খান, ফোরাম অন ইকোনমিক এন্ড আলাপমেন্ট নেত্রকোনার যোগাযোগ ও গণমাধ্যম সম্পাদক মেহেদী হাসান আকন্দ, এআরএফবি চেয়ারম্যান দিলওয়ার খান সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)-এর উদ্যোগে এবং অন্যচিত্র ফাউন্ডেশন, প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম-নেত্রকোনা ও উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)-এর সহ-আয়োজনে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যচিত্র ফাউন্ডেশন এর নির্বাহী পরিচালক রেবেকা সুলতানা জানান, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬-২০৫০) প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনসম্পৃক্ততা, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। জনশুনানি ও স্বচ্ছ পরামর্শ ছাড়াই এই পরিকল্পনা অনুমোদনের চেষ্টা পূর্ববর্তী সরকারের অস্বচ্ছ ও কর্তৃত্ববাদী নীতিনির্ধারণের পুনরাবৃত্তি মাত্র।”
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল কেবল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন জ্বালানি পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। যেভাবে অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ব্যবহার করে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, ইপিএসএমপি ২০২৫ সেই একই পথে ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে।
মহাপরিকল্পনায় “এনার্জি ট্রানজিশন”-কে ব্যপক প্রচার করা হলেও বাস্তবে প্রকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ সেখানে মাত্র ১৭%, যেখানে কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪%। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫.৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫.২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ২৫ বছর পরও এলএনজি , কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা ৫০% থাকবে- যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচার (সিসিএস)ু এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয় এবং ভবিষ্যতে দেশকে নতুন ঋণ, ভর্তুকি ও পরিবেশগত সংকটে ফেলবে।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কার্বন নির্গমন হবে ১৮৬.৩ গঃঈঙ₂ব, যা দেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি)-এর লক্ষ্য এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গে এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে বিরোধী। পাশাপাশি শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায্যতা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পোশাক খাতের সবুজায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিকল্পনায় প্রায় উপেক্ষিত রাখা হয়েছে।
প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে জোরালো দাবি:
● অবিলম্বে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) স্থগিত এবং সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
● নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করতে হবে।
● জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে, বাস্তবসম্মত ১০০% নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
● ন্যায্য, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অন্যথায়, খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিণত হবে আরেকটি জনবিরোধী, অস্বচ্ছ এবং দায়মুক্তিমূলক নথি, যা দেশের জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
