নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
“শূণ্য হতে শূণ্য হয়ে শূণ্যে বদ্ধ রই আবার, তুমি শূণ্য আমি শূণ্য শূণ্য আমার চারিধার।। দুনিয়ায় সব শূণ্য কাণ্ড শূণ্যময় এই ব্রহ্মাণ্ড, বিচারকালে শূণ্য দণ্ড শূণ্যে শূণ্য এক আকার।।”
বাউল সাধক জালাল উদদ্দিন খাঁ’র এমন অসংখ্য বাউলগান বিশ্বদরবারে তুলে ধরে খ্যাতির শীর্ষে থাকা নেত্রকোনার কেন্দুয়ার গড়াডোবা ইউনিয়নের বান্দনাল গ্রামে জন্ম নেয়া উপমহাদেশের প্রখ্যাত বাউল কবি সংগীতের সাধক, বাউল শিরোমণি সুনীল কর্মকার ৭১ বছর বয়সে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
বৃহস্পতিবার ভোররাত (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ৪টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই খ্যাতিমান শিল্পী। তিনি স্ত্রী আশা রানী কর্মকার, চাকুরীজীবী দুই ছেলে বিশ্বজিৎ কর্মকার, প্রশেনজিৎ কর্মকার,আত্মীয়-স্বজনসহ বহু শিষ্য ভক্ত ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে কেবল একজন শিল্পীর জীবনাবসানই নয়, নিভে গেল বাউল সাধনার এক দীপ্তময় প্রদীপ, দর্শনবাদের মহাজন।
তাঁর শিষ্যরা জানান, সুনীল কর্মকার ছিলেন বাউল সংগীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি বটবৃক্ষ। গান ছিল তাঁর কাছে কেবল সুর আর কথা নয় ছিল আত্মানুসন্ধানের পথ, যে পথ মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের সেতু তৈরী করে। সহজ কথায় গভীর জীবনদর্শন প্রকাশ করার যে বিরল সম্মোহনী ক্ষমতা বাউল গানের, তিনি তা সাধন, অনুভব ও দায়ীত্বশীলতার সঙ্গে আজীবন লালন ও প্রকাশ করে গেছেন।
তাঁর কণ্ঠে ধরাট বাউল গান হয়ে উঠত প্রশ্ন-উত্তর, সূফি ও সাধুবাদের প্রেমময় আত্মার আর্তি। ছোটবেলা থেকে দীর্ঘ সাধনার এই পথে তিনি শুধু একজন গৃহীবাদের বাউশিল্পী হিসেবেই নয়, একজন গুরুর আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছিলেন।
অসংখ্য শিষ্য, তরুণ শিল্পী ও সংগীতানুরাগীরা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছেন দীক্ষা, অনুপ্রেরণা ও মানবিকতার পাঠ। অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন বাউল গানের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান যাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ, লোকজ সংস্কৃতির প্রতি অটল দায়বদ্ধতা।
তাঁর গানে ছিল সূফিবাদ লালন-দর্শনের ছায়া। ছিল দেহতত্ত্বের গভীরতা, আবার ছিল মাটির গন্ধমাখা সাধারণ মানুষের জীবনকথা। মঞ্চে কিংবা আখড়ায়, আসরে-বৈঠকে, শহরে কিংবা গ্রামে যেখানেই তিনি গান গেয়েছেন সেখানেই সৃষ্টি হয়েছে এক ধ্যানমগ্নতার আবহ।
যেখানে শ্রোতারা শুধু গান শুনেননি, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এমন কি পরমাত্মার অনুসন্ধানে হয়েছেন ব্রতী।বাউলশক্তি সুনীল কর্মকারের প্রয়াণে বাউল সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। সহশিল্পী ও ভক্তদের কাছে তাঁর চলে যাওয়া যেন এক বটবৃক্ষের পতন-যার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তিনি চলে গেলেও রেখে গেলেন অগণিত গান, স্মৃতি আর সাধনার উত্তরাধিকার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাউল সংগীতকে পথ দেখাবে।
তাঁর অকালমৃত্যুতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পী ও শুভানুধ্যায়ী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহশিল্পী ও ভক্তদের প্রতি জানানো হয়েছে গভীর সমবেদনা।
ভক্তরা বলেন, তাঁর চোখের আলো না থাকলেও অন্তরচক্ষু দিয়ে তিনি বাউল জগতে হয়ে উঠেছিলেন নক্ষত্রসম বাউল যাদুকর। বাউল দর্শনে ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য। আজ হয়ত সুনীল কর্মকারের কণ্ঠ থেমে গেছে, কিন্তু তাঁর গান থামবে না। মানুষের হৃদয়ে, আখড়ায়,বৈঠকের ধুলোয়, বাতাসে ভেসে থাকা গানের সুরে তিনি থাকবেন চিরকাল অমর-অক্ষয় হয়ে।
