কলমাকান্দা প্রতিনিধি :
নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার কালাকোণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন-কাম-ফ্লাড শেল্টার নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে প্রশাসন, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারের অনুমোদিত প্ল্যান-ইস্টিমেট ও ডিজাইন লঙ্ঘন করে নিম্নমানের ও অপ্রতুল নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে সরকারি অর্থের অপচয় ও প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পিইডিপি-৪ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প এর আওতায় কালাকোণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন-কাম-ফ্লাড শেল্টার নির্মাণের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাইভ ব্রাদার্স, যার সত্ত্বাধিকারী আরাধন ও জিল্লুর রহমান।
তিনতলা বিশিষ্ট ভবনটির চুক্তিমূল্য ১ কোটি ৩৩ লাখ ৫৫ হাজার ৩৩৬ টাকা এবং নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।
কিন্তু সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। বরং এক বছর এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও কাজ চলছে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে—তিন তলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাই করা হলেও অনেক অংশ অসমাপ্ত।
প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার খাতুন বলেন, “বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও ঠিকাদার ও উপজেলা এলজিইডি অফিস থেকে আমাকে ভবন নির্মাণের প্ল্যান, ইস্টিমেট ও ডিজাইন দেওয়া হয়নি। অনুমোদিত নকশায় পাইলিং ভিত্তির কথা থাকলেও তা না করে শুধুমাত্র বেইজমেন্টের ওপর ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নিম্নমানের ইট, বালি, পাথর ও রড ব্যবহার করা হয়েছে।”
তিনি ইতিমধ্যে বিষয়টি লিখিতভাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন, লুৎফর জামান ফকির, হারেছ ফকিরসহ অনেকে বলেন, “ভবনটি দেখলেই বোঝা যায় দায়সারা কাজ হয়েছে। বিল ও নদী থেকে অনুপযোগী মাটি-বালি ব্যবহার করা হয়েছে। হাওর এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণে পাইলিং অপরিহার্য—তা করা হয়নি। ভবনটি এখনই ভেঙে নতুন করে নির্মাণ না করলে এটি টিকবে না।”
এ বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা প্রকৌশলী মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, “ডিজাইনে পাইলিং থাকলেও তা করা হয়নি, কেবল বেইজ দিয়েই ফাউন্ডেশন সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা বিল ছাড় দেওয়া হয়েছে। ভবনটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে, প্রক্রিয়া চলছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাইযুল ওয়াসীমা নাহাত বলেন, “ঠিকাদার ও স্থানীয় এলজিইডির প্রকৌশলীদের দায়িত্ব এই কাজের তদারকি করা। আমরা ফাইনাল বিলের সময় কাজ দেখি। অভিযোগ পাওয়ায় বিষয়টি এলজিইডির মাধ্যমে তদন্ত করা হবে।”
নেত্রকোণা জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “আমি সদ্য যোগদান করেছি। উপজেলা থেকে টেন্ডার হয় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভাপতি ও উপজেলা প্রকৌশলী সদস্য সচিব হিসেবে কাজের তদারকি করেন। ডিজাইন লঙ্ঘন করে পাইলিং ছাড়া ফাউন্ডেশন করা অনিয়ম, এজন্য কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “পাইলিং ছাড়া ভবন নির্মাণ করলে স্থিতিশীলতা কমে যায়, ভূমিকম্পের সময় তা সহজেই ভেঙে পড়তে পারে। এটি আইনগতভাবেও জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অনিয়ম, দুর্নীতি ও তদারকির অভাবে ভবনটি নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা পাইলিংবিহীন এই ভবন ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
