মুহা. জহিরুল ইসলাম অসীম :
নেত্রকোনায় বিভিন্ন নদ নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বুধবার ৯টা পর্যন্ত মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে নেত্রকোনায়। ভাড়ি বর্ষন ও পাহাড়ি ঢলে কংস নদের জারিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ৭ দশমিক ১৭ মিটার।
বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে এ তথ্য জানা যায়, অব্যাহত বৃষ্টির কারণে পানি বেড়ে হাওরে কৃষকের চোখের সামনেই খেতের পাকা বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু ফসল রক্ষা বাঁধের কাছে পানি চলে এসেছে। তবে এখনো বাঁধ ভাঙেনি। শুধু হাওরেই নয় উচু এলাকার জমির বোরো জমিতেও পানি জমে ধানও তলিয়ে যাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে নেত্রকোনায় থেমে থেমে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল ১১টা পর্যন্ত পর্যন্ত বৃস্টি হওয়ায় কংস, ধনু, উব্দাখালী, সোমেশ্বরী, মগড়া, ভুগাইসহ সব কটি নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকে। এতে কংস নদের জারিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এ ছাড়া ধনু নদের খালিয়াজুরী পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ৪ দশমিক ১৫ মিটার। সকাল ৯টার দিকে সেখানে প্রবাহিত হচ্ছিল ৩ দশমিক ৮৬ মিটার।
পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে। পাশপাশি উচু এলাকা আটপাড়া, বারহাট্টা, পূর্বধলাসহ বিভিন্ন উপজেলায় বোরো জমিতে পানি জমে জলাবদ্ধা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে আছেন এলাকার কৃষকেরা। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে পানি বাড়তে থাকলে অকালবন্যায় তাদের বহু কষ্টে উৎপাদিত ফসল হারাতে হবে। হাওরে মাত্র ৫২ শতাংশ জমিতে ধান কাটা হয়েছে। ফসলহানি ঘটলে ওই সমস্ত এলাকার কৃষকদের সারা বছর সংসার চালানো, ছেলে মেয়েদের লেখাপাড়ার খরচ চালানো কষ্টকর হয়ে পড়বে।
হাওরে এবছর ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। নেত্রকোনায় ধানের মোট আবাদ ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর| উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। গত কয়েক বছর হার্ভেস্টার যন্ত্র দিয়ে কৃষকেরা হাওরে ফসলের খেতের ধান কেটেছেন। পাশাপাশি শ্রমিক দিয়েও ধান কাটা হতো। কিন্তু এবার অতিরিক্ত বৃষ্টি হওয়ার কারণে অধিকাংশ খেতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটার যন্ত্র সেখানে চালানো যাচ্ছে না। আর শ্রমিক সংকটও রয়েছে। বৃষ্টির সাথে বজ্রপাত হওয়ায় কৃষকেরা ধান কাটতে মাঠে যেতে ভয় পাচ্ছেন। গত এক মাসে বজ্রপাতে খালিয়াজুরী, আটপাড়া, দুর্গাপুরে হাওরে পাঁচজন প্রাণ হারান|। গত মঙ্গলবার একদিনেই খালিয়াজুরীতি তিনজন মারা যান।
অন্যদিকে অতিবৃষ্টির পানিতে পাকা ধান নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খালিয়াজুরীর ছায়ার হাওর, বায়রা হাওর, চুনাই হাওর, বাইদ্যার চর, কাটকাইলেরকান্দা, নন্দের পেটনা, কীর্তনখলা, রয়াইল, মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা, মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী, উচিতপুর, কদমশ্রী, কলমাকান্দার সোনাডুবি, গোরাডোবা, আঙ্গাজুরা, মহিষাশুরা, মেদী, তেলেঙ্গাসহ বেশ কিছু হাওরের পানিতে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে| এ ছাড়া অধিকাংশ ফসলী জমিতে হাঁটুর ওপরে পানি জমেছে।
খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুরের আবদুস সালাম বলেন, ‘ধুন নদের পানি বাড়তাছে। বিভিন্ন হাওর ও বেড়ি বাঁধের কাছে পানি চলে এসেছে। সব ধান ডুইব্বা যাইতাছে। হাওরে অহনো অর্ধেক খেতের ধান কাটনের বাকি। ধান কাটনের লোক পাওয়া যাইতাছে না।’
খালিয়াজুরীর কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, পানিতে বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। এখনো উপজেলায় অর্ধেক খেতের ধান কাটা বাকি।’
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘অনেক হাওরে বৃষ্টির পানি জমেছে। তবে এখনো সব কটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। ভারতের চেরাপুঞ্জি, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এতে পানি আরও বেড়ে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই বাঁধ হুমকির মুখে পড়বে। উপজেলা প্রশাসনকে নিয়ে আমরা এলাকায় অবস্থান করছি। ফসল রক্ষা বাঁধ রক্ষায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে।’
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, ‘কৃষকরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কাটতে পারে, সে জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ইউএনওরা মাঠে আছেন। তাঁদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
