নেত্রকোনা প্রতিনিধিঃ
নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস্য ধান উৎপাদন। ধান উৎপাদন করে আয়ের টাকায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবারের ব্যয়সহ সকল খরচ বহন করা হয়। আর ওই ধান ফসল রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রতি বছর বাঁধ সংস্কার করে থাকে।
গত কয়েক বছর ধরে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প কমিটি গঠন ও সংস্কার কাজ শুরু হচ্ছে না। তবে পাউবো’র দাবি হাওরের পানি নামতে বিলম্ব হওয়ায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে। প্রশাসন বলছে কাজ শুরু করতে দেরি হলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করা হবে। এ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ফসলহানির আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাওরে এক সময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণ করা হতো। ২০১৭ সালে হাওরে ব্যাপক ফসলহানি হওয়ার পর বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ড ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের নতুন নীতিমালা প্রনয়ন করে। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য প্রকৃত কৃষক স্থানীয় সুবিধাভোগীদের নিয়ে ৫ থেকে ৭ সদস্যের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী একটি পিআইসি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারে।
নেত্রকোনা জেলার অধীনে ৩৬৫ কিলোমিটার অস্থায়ী ডুবন্ত বাঁধ রয়েছে। এসব বাঁধের ওপর হাওরে কৃষকদের প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভর করে।
এ বছর বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য এখনও প্রকল্প নির্ধারণ হয়নি। গতবছর জেলায় ১৯১টি প্রকল্পে ১৭৩ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার বেশী ব্যয় হয়। হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৩০ অক্টোবর প্রকল্প নির্ধারণ করে ৩০ নভেম্বর পিআইসি কমিটি গঠন করতে হয়। ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারী কাজ শেষ করার নিয়ম রয়েছে।
কিন্তু এ বছর গত ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের সার্ভের কাজ চলমান থাকায় প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়নি। এ কারণে প্রকল্পও অনুমোদন হয়নি। ফলে বাঁধের কাজ শুরু করতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে।
এলাকার কৃষকরা বলছেন, ডিসেম্বর মাসের ২২ তারিখ পেরিয়ে গেলেও কাজ শুরু হয়নি। এখন ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ পুরোদমে চলার কথা। কিন্তু পাউবোর লোকজন মাপামাপির কাজ করছে। বাঁধের কাজ শুরুই হয়নি কবে শেষ করবে কেউ বলতে পারছে না। যেভাবে ঢিলেমিশি হচ্ছে সময় মতো কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে আগাম বন্যায় কিছু বাঁধ ফসলহানির কারণ হতে পারে।
বারহাট্টা উপজেলার মোহনপুর গ্রামের নিওন আহমেদ, মনির হোসেন পাঠান, মোহনগঞ্জ উপজেলার বেতাম গ্রামের মাসুদ, সুখদেবপুর গ্রামের হাসান, খালিয়াজুরী উপজেলার চাকুয়া শিবির এলাকার নূর আহমদ, লিপসিয়া আজিজুল হক, রসুলপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান, মদন উপজেলার কাতলা গ্রামের নূরুল হুদা, ঘাটুয়া গ্রামের আবুল কালাম, গোবিন্দশ্রী গ্রামের সুজন মিয়াসহ অনেকেই জানান, হাওরে এক ফসলী জমি। এ থেকে উৎপাদিত ফসলের আয় দিয়ে সারা বছরের পরিবারের জীবিকাসহ ব্যয়ভার নির্বাহ করা হয়। হাওর থেকে পানি নেমে গেছে। জমিতে ধান রোপন পুরোদমে শুরু হয়েছে। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ কাজ এখনও শুরু হয়নি। যদি আগাম বন্যা হয় তাহলে ফসল পানিতে তলিয়ে নস্ট হয়ে যাবে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, উপজেলা থেকে কমিটি গঠন করতে দেরী হচ্ছে। হাওর থেকে পানি নামতে দেরী হচ্ছে এবং বাঁধের পাশের মাটিও শুকায়নি। বাঁধের সার্ভের কাজ চলমান। আগামী সপ্তাহে ফসলরক্ষার বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিটি গঠন করে ফসলরক্ষা বাঁধের নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করা হবে।
