মদন সংবাদদাতাঃ
নেত্রকোনার মদনে ৬৬৭ বস্তা (২০ মেট্রিকটন) সরকারি চাল পাচারের ঘটনায় থানায় মামলা হলেও মামলার বাদী ও সাক্ষী করা হয়েছে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাদ্য বিভাগের দুই কর্মকর্তাকেই। অন্যদিকে ট্রাকচালক, হেলপার ও এক স্থানীয় ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, খাদ্য বিভাগের দুর্নীতি আড়াল করতেই এমন কৌশল নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গুদামে চালের হিসাব তদারকি করা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও গুদাম কর্মকর্তার দায়িত্ব। তাদের অজান্তে এত বিপুল পরিমাণ চাল গুদাম থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও গুদাম কর্মকর্তার যোগসাজশেই দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাল নিয়ে অনিয়ম চলছিল। এখন নিজেদের দায় এড়াতে ট্রাকচালক ও হেলপারকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০ টার দিকে মদন উপজেলার নেত্রকোনা – মদন সড়কের সাম্য ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে চাল ভর্তি ট্রাকটি জব্দ করে প্রশাসন। এসময় চালক ও হেলপারকে আটক করা হয়। আজ সকালে এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্পের (কাবিখা ও জিআর) আওতায় বরাদ্দ পাওয়া চাল মদন উপজেলা খাদ্য গুদাম থেকে প্রকল্প সভাপতি বা ডিও হোল্ডারদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম প্রকল্প সভাপতি ও ডিও হোল্ডারদের কাছে ৬৬৭ বস্তায় প্রায় ২০ মেট্রিকটন সরকারি চাল বুঝিয়ে দেন। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭ লাখ টাকা।
এজাহারে আরও বলা হয়, পরে গুদাম কর্মকর্তা জরুরি কাজে আঠারোবাড়ি, ঈশ্বরগঞ্জে চলে গেলে ট্রাকচালক শামীম, হেলপার শাহীন ও স্থানীয় ব্যবসায়ী এনামুল হক আনার যোগসাজশে চালগুলো বারহাট্টা উপজেলার বাউসী এলাকার তালুকদার অটোরাইস মিলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
পরে স্থানীয়রা বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে নেত্রকোনা-মদন সড়কের সাম্য ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে চালবোঝাই ট্রাকটি আটক করে প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করে।
এ ঘটনায় ট্রাকচালক শামীম (৩০), হেলপার মো. শাহীন (৩৫) ও ব্যবসায়ী মো. এনামুল হক আনারকে (৬০) আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দুলাল মিয়া। আর সাক্ষী করা হয়েছে গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলমকে।
তবে এ মামলার পর থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, টিআর-কাবিখাসহ বিভিন্ন প্রকল্পের চালের ডিও গত এপ্রিল মাসেই শেষ হয়েছে। চলতি মে মাসে এসব প্রকল্পে কোনো ডিও (চাহিদাপত্র) নেই। এছাড়া এসব প্রকল্পে সাধারণত দেড় থেকে দুই মেট্রিকটনের বেশি চাল বরাদ্দ হয় না। সেখানে একসঙ্গে ২০ মেট্রিকটন চাল ট্রাকে করে নেওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, ডিওর চাল তিন দিনের মধ্যে গুদাম থেকে উত্তোলন করতে হয়। মূলত টিসিবি ও বিভিন্ন প্রকল্পের চাল কিনে দীর্ঘদিন ধরে গুদামে মজুত করা হচ্ছিল। সেই চালই পাচারের চেষ্টা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, গুদামে দীর্ঘদিন প্রকল্পের ডিও’র চাল রাখার নিয়ম নেই। এটা গুদাম কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয়। তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের এতে যোগসাজশ না থাকলে এতবড় অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। অভিযুক্তরাই হয়ে গেলেন বাদী-স্বাক্ষী। তবে সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
আজ সকালে এ বিষয়ে জানতে চাইলে গুদাম কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম কোন স্পষ্ট বক্তব্য না দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
কোন স্পষ্ট বক্তব্য দেননি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দুলাল মিয়া। তিনিও দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
এ ব্যাপারে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন,‘ মদন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দুলাল মিয়ার লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিয়মিত মামলা রজু হয়েছে। মামলার এজহার নামীয় দুই আসামিকে শুক্রবার বিকেলে নেত্রকোনা আদালতে পাঠানো হয়েছে। বাকী আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাওলিন নাহার বলেন, প্রকল্পের চাল ডিও হোল্ডারদের গতকাল বৃহস্পতিবার গুদাম থেকে দেওয়া হয়েছে। পরে সেগুলো পাচার করে দেওয়া হচ্ছিল। খবর পেয়ে সেগুলো জব্দ করা হয়। জব্দের ঘটনায় মামলা হয়েছে। গতকালই চালগুলোর ডিও অনুমোদন হয়েছিল।
চলতি মে মাসে কোন প্রকল্পের ডিও অনুমোদন হয়নি। তাহলে গতকালের ডিও অনুযায়ী চাল বিতরণ হলো কেমনে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়টা খাদ্য বিভাগ তদন্ত করবে। খাদ্য কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ থাকলেও তারা আসামি না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটাও খাদ্য বিভাগ তদন্ত করে বের করবে।
এদিকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোয়েতাছেমুর রহমান প্রথমে নানা যুক্তি দিয়ে খাদ্য কর্মকর্তাদের নির্দোষ দাবি করলেও একপর্যায়ে তিনি বলেন, চলতি মে মাসে এসব প্রকল্পের চালের কোন ডিও হয়নি। গত এপ্রিলের ডিও হওয়া চাল গুদামে রেখে দেওয়া হয়েছিল। অনেক সময় ব্যবসায়ীরা চাল নিতে দেরি করে, তখন তো আর জোর করে তাদের দেওয়া যায় না। তাই গতমাসের চালই গতকাল দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টা অনিয়ম হলেও অনেক সময় নানা কারনে সেটা করতে হয়।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে পুলিশও তদন্ত করবে। যোগসূত্র পেলে তারাও ব্যবস্থা নিতে পারবে।
