দিলওয়ার খান, নেত্রকোনা।।
একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ছিল নেত্রকোনাবাসীর বহুদিনের স্বপ্ন। ২০১৮ সালে নেত্রকোণা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই স্বপ্নের যাত্রা শুরু হলেও আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কলেজটির জন্য নির্ধারিত হয়নি নিজস্ব ভূমি কিংবা স্থায়ী ক্যাম্পাস। ফলে অস্থায়ী ভবন ও জরাজীর্ণ আবাসিক কোয়ার্টারে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের আবাসন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নেত্রকোণা আধুনিক সদর হাসপাতালের পুরোনো কোয়ার্টারকে অস্থায়ী ক্যাম্পাস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শুরুতে দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়েও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ইতোমধ্যে কলেজের প্রথম ব্যাচ চিকিৎসাশিক্ষা সম্পন্ন করে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু তারা নিজেদের মেডিকেল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস কোথায় হবে—সেই উত্তর না পেয়েই বিদায় নিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের সংকট বহুমাত্রিক:
নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজের অপরিহার্য অবকাঠামো থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। নেই আধুনিক অডিটোরিয়াম, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, মানসম্মত ক্যাফেটেরিয়া কিংবা পর্যাপ্ত আবাসিক হল। পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিক্ষার্থীদের থাকতে হচ্ছে, যা নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তুলিফ মাহমুদ বলেন, “অনেক স্বপ্ন নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় প্রয়োজনীয় অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না। ভালো লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম ও আবাসিক হলের অভাবে শিক্ষাজীবন কঠিন হয়ে উঠেছে।”
আরেক শিক্ষার্থী সাদমান সাইফুল্লাহ নাফি বলেন, “আট বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাসের কোনো অগ্রগতি হয়নি। আমরা চাই, সরকার দ্রুত ভূমি নির্ধারণ করে নির্মাণকাজ শুরু করুক।”
এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, “নিজস্ব ছাত্রীনিবাস না থাকায় বাইরে থেকে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।”
শিক্ষকরাও পড়ছেন সীমাবদ্ধতায়:
শিক্ষকরাও মনে করছেন, অস্থায়ী ক্যাম্পাসে একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। সীমিত অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
এনাটমি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসির আহমেদ বলেন, “অস্থায়ী ক্যাম্পাসের কারণে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজের সব সুবিধা এখানে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবুও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
ভূমি নির্ধারণে অনিশ্চয়তা:
কলেজটির স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য ইতোমধ্যে দুটি স্থানের প্রস্তাব আলোচনায় আসে। একটি হলো নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৯৮ একর জমির মধ্যে অব্যবহৃত প্রায় ৪০ একর ভূমি। অন্যটি সদর উপজেলার বালি মৌজায়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্থানই চূড়ান্ত হয়নি।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মুহাম্মদ সাইফুল হাসান বলেন, “প্রস্তাবিত দুটি জায়গার কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ভূমি নির্ধারণ বিষয়ে সরকারিভাবে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। দ্রুত ভূমি নির্ধারণ করে একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস নির্মাণ করা প্রয়োজন।”
শিক্ষক সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ:
বর্তমানে ৩৩৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪০ জন। সার্জারি, চক্ষু ও নিউরোমেডিসিনসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, এমনকি কিছু বিভাগে কোনো শিক্ষকও নেই। ফলে পাঠদান ও ক্লিনিক্যাল শিক্ষায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
স্থায়ী ক্যাম্পাসের দাবিতে মানববন্ধন:
এদিকে মেডিকেল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবিতে বুধবার দুপুরে নেত্রকোণা নাগরিক অধিকার কমিটির উদ্যোগে শহরের প্রেসক্লাব সড়কে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, জনউদ্যোগ ফেলো শ্যামলেন্দু পাল, নেত্রকোণা প্রেসক্লাবের সম্পাদক মাহাবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী (হেলিম), নাগরিক অধিকার কমিটির সদস্য সচিব নাজমুশ শাহদাত ও সভাপতি এবিএম আব্দুল হাদি ফরাজী বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, আট বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলা সদর হাসপাতালের কোয়ার্টারে মেডিকেল কলেজ পরিচালনা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শুরু করার পাশাপাশি জেলার স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।
নাগরিকদের প্রত্যাশা:
নেত্রকোণার সচেতন মহলের মতে, একটি মেডিকেল কলেজ শুধু চিকিৎসক তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি জেলার স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। আট বছর পরও স্থায়ী ক্যাম্পাস না হওয়ায় জেলার মানুষ হতাশ।
তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে নেত্রকোণা মেডিকেল কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া হবে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাবে, অন্যদিকে নেত্রকোণার স্বাস্থ্যখাতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
